কথার কঠোরতা নয়, চাই দুর্নীতিবিরোধী কার্যকর ব্যবস্থা
- আপলোড সময় : ১৭-০৩-২০২৬ ১২:০৭:৫৫ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৭-০৩-২০২৬ ১২:০৭:৫৫ পূর্বাহ্ন
সিলেট বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবীর দোয়ারাবাজারে দেওয়া বক্তব্য নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী, প্রয়োজনীয় এবং জনমনে আশার সঞ্চারকারী। “এখন থেকে কোনো ধরনের ঘুষ-দুর্নীতি সহ্য করা হবে না” - এই ঘোষণা শুধু প্রশাসনিক বার্তা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার পুনঃপ্রতিষ্ঠারও আহ্বান। দুর্নীতির বিরুদ্ধে এমন সুস্পষ্ট ও কঠোর অবস্থান নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাস্তবতায় ঘুষ ও দুর্নীতি বহুদিনের এক গভীর ব্যাধি। এটি শুধু অর্থের অপচয় ঘটায় না, মানুষের অধিকার হরণ করে, উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করে, সেবাকে জটিল করে তোলে এবং সাধারণ নাগরিককে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীন করে তোলে। একজন সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী যখন দায়িত্বের স্থানে থেকে জনগণের ন্যায্য অধিকারকে জিম্মি করেন, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত অনৈতিকতা নয়; সেটি পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে আঘাত করে। এ কারণে বিভাগীয় কমিশনারের বক্তব্যকে বিচ্ছিন্ন কোনো সতর্কবার্তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটিকে শুদ্ধ প্রশাসন প্রতিষ্ঠার একটি জরুরি অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর এই মন্তব্য যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতি করলে তাদের “ঠিকানা হবে জেলখানা”। দেশে দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য নতুন নয়, কিন্তু সমস্যা হলো- বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব প্রয়োগের ফারাক। অনেক সময় দেখা যায়, মাঠপর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, কিন্তু তদন্ত দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে থাকে; শাস্তি হয় না, দায় নির্ধারণ হয় না, বরং অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে উচ্চারিত কঠোর ভাষা জনসাধারণের কাছে কার্যকর বার্তার বদলে আনুষ্ঠানিকতার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। তাই এবার প্রয়োজন কথার কঠোরতার সঙ্গে আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের দৃশ্যমান বাস্তবায়ন।
বিভাগীয় কমিশনার যে বিষয়টি তুলে ধরেছেন- মৃত ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে বিপুল অর্থ অপচয়, তা শুধু অনিয়ম নয়, এটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত বহন করে। এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে, কোথাও না কোথাও তদারকির অভাব, জবাবদিহির শৈথিল্য এবং দায়িত্বহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। একটি আধুনিক প্রশাসন ব্যবস্থায় এমন অনিয়ম কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না। তাই অতীতের ভুল “ভুলে গিয়ে” নতুনভাবে কাজ শুরু করার পাশাপাশি, সেই ভুলের উৎস শনাক্ত করা, দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতের জন্য কাঠামোগত সুরক্ষা তৈরি করাও সমান জরুরি।
দুর্নীতি রোধে কেবল শাস্তির ভয় যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে, ফাইলপ্রক্রিয়া ও সেবাদানকে ডিজিটাল করতে হবে, অভিযোগ গ্রহণ ও নি®পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং জনগণের জন্য সেবাপ্রাপ্তির পথ সহজ করতে হবে। একই সঙ্গে সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহিত করা এবং দুর্নীতিবাজদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা - দুই দিকেই সমান জোর দিতে হবে। দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সততা এবং সামাজিক প্রতিরোধ - এই তিনটির সমন্বয় ছাড়া স্থায়ী ফল আসবে না।
বিভাগীয় কমিশনার তার বক্তব্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং মানবিক গুণাবলির কথাও বলেছেন। নিঃসন্দেহে ব্যক্তিগত সততা ও নৈতিক চর্চা দুর্নীতি প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখে। তবে কেবল নৈতিক উপদেশ দিয়ে দুর্নীতি নির্মূল সম্ভব নয়, যদি প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকে এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা অকার্যকর হয়। সৎ ব্যক্তি দিয়ে সৎ প্রশাসন গড়ে উঠতে পারে, কিন্তু সেই প্রশাসনকে টেকসই করতে চাই শক্তিশালী নিয়ম, নিরপেক্ষ নজরদারি এবং আইনের সমান প্রয়োগ।
আজ জনগণ আশ্বাসের চেয়ে বেশি কিছু দেখতে চায়। তারা দেখতে চায় - ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া যাচ্ছে, অনিয়মকারীরা শাস্তি পাচ্ছে, ক্ষমতার অপব্যবহার কমছে, সরকারি অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে। বিভাগীয় কমিশনারের বক্তব্য সেই প্রত্যাশাকে নতুন করে বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের-এই বার্তাকে বাস্তব রূপ দেওয়া।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার ঘোষণা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা প্রশাসনের প্রতিটি ডেস্ক, প্রতিটি দপ্তর এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হবে। জনগণের রাষ্ট্রকে জনগণের কাছেই ফিরিয়ে দিতে হলে এখন আর কেবল হুঁশিয়ারি নয়, চাই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়